দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ (মাছের পুকুর)

    লেখার আকার:
    কৃষিশিক্ষা - দ্বিতীয় অধ্যায়: দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ (মাছের পুকুর)
    📚 কৃষিশিক্ষা - অধ্যায় ২: পরিচ্ছেদ ২
    দাখিল - নবম ও দশম শ্রেণি

    কৃষিশিক্ষা

    দ্বিতীয় অধ্যায়: কৃষি উপকরণ

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মাছের পুকুর

    মাছের পুকুর

    পুকুর কী? (What is a Pond?)

    পুকুর হলো ছোট ও অগভীর একটি বদ্ধ জলাশয়, যেখানে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে মাছ চাষ করা যায় এবং প্রয়োজনে সহজেই সম্পূর্ণ শুকিয়ে ফেলা যায়।

    এক কথায়, পুকুর হচ্ছে চাষযোগ্য মাছের বাসস্থান।

    জেনে রাখা ভালো: পুকুরের পানির গভীরতা সাধারণত ০.৫ থেকে ২ মিটার পর্যন্ত সুবিধাজনক।
    পুকুরের দৃশ্য একটি শান্ত পুকুরের দৃশ্য

    আদর্শ পুকুরের বৈশিষ্ট্য

    মাছ চাষ সফল করার জন্য একটি পুকুরের কিছু আদর্শ বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন:

    • বন্যামুক্ত: পুকুর অবশ্যই বন্যামুক্ত হতে হবে। এজন্য পুকুরের পাড় যথেষ্ট উঁচু হতে হবে।
    • সূর্যালোক: পুকুরে যেন পর্যাপ্ত রোদ পড়ে, সেজন্য পাড়ে বড় গাছপালা থাকা যাবে না। রোদ পড়লে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয়।
    • মাটির গুণাগুণ: পুকুরের মাটি দোআঁশ, পলি দোআঁশ বা এঁটেল দোআঁশ হলে সবচেয়ে ভালো।
    • পানির স্তর: সারা বছর পানি থাকে এমন পুকুর চাষের জন্য উত্তম।
    • কাদার স্তর: তলদেশে অতিরিক্ত কাদা থাকা যাবে না (২০-২৫ সে.মি. এর বেশি নয়)।

    "আদর্শ পুকুরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ করে এবং এটি বন্যামুক্ত থাকে।"

    পুকুরের পানির স্তর (Layers of Pond)

    তাপমাত্রা, অক্সিজেন এবং প্লাংকটন (প্রাকৃতিক খাদ্য) এর তারতম্যের কারণে পুকুরের পানিকে সাধারণত ৩টি স্তরে ভাগ করা হয়:

    ১. উপরের স্তর (Surface Layer): এই স্তরে প্রচুর আলো-বাতাস থাকে। অক্সিজেনের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি এবং ফাইটোপ্লাংকটন বেশি পাওয়া যায়।
    ২. মধ্য স্তর (Middle Layer): এখানে আলোর প্রবেশ কিছুটা কম। জুপ্লাংকটন (প্রাণিকণা) এই স্তরে বেশি ঘোরাফেরা করে।
    ৩. নিচের স্তর (Bottom Layer): পুকুরের তলদেশ। এখানে রোদ পৌঁছায় না, অক্সিজেনও কম থাকে। এখানে বিভিন্ন কীট, শামুক-ঝিনুক ও তলদেশের জৈব পদার্থ থাকে।

    কোন স্তরে কোন মাছ বাস করে?

    পুকুরে বিভিন্ন স্তরের প্রাকৃতিক খাবার সদ্ব্যবহারের জন্য স্তরের সাথে মিলিয়ে মাছ ছাড়তে হয়:

    পুকুরের স্তর যেসব মাছ বাস করে খাদ্যভ্যাস
    উপরের স্তর সিলভার কার্প, কাতলা, সরপুঁটি ফাইটোপ্লাংকটন (উদ্ভিদকণা)
    মধ্য স্তর রুই মাছ জুপ্লাংকটন (প্রাণিকণা) ও ক্ষুদ্র পোকা
    নিচের স্তর মৃগেল, কালবাউশ, শিং, মাগুর, পাঙ্গাশ তলদেশের প্রাণী ও পচা জৈব পদার্থ
    সব স্তর তেলাপিয়া সব স্তরের খাবার খায়

    পুকুরের প্রকারভেদ (Types of Ponds)

    মাছ চাষের বিভিন্ন ধাপের (মাছের বয়সের) ওপর ভিত্তি করে পুকুরকে প্রধানত ৩ ভাগে ভাগ করা হয়:

    1. আঁতুড় পুকুর (Nursery Pond)
    2. পালন পুকুর (Rearing Pond)
    3. মজুত পুকুর (Stocking Pond)
    পুকুরের প্রকারভেদ

    আঁতুড়, পালন ও মজুত পুকুর

    • ১. আঁতুড় পুকুর (Nursery Pond): যে পুকুরে রেণু পোনা (হাচলিং) ছেড়ে ধানী পোনা (১৫-২৫ মি.মি. লম্বা) হওয়া পর্যন্ত বড় করা হয়। এখানে পোনা সাধারণত ১৫-৩০ দিন রাখা হয়। এর আয়তন ১০-১৫ শতক হলে ভালো।
    • ২. পালন পুকুর (Rearing Pond): যে পুকুরে ধানী পোনা ছেড়ে আঙুলিপোনা বা চারা পোনায় (৭-১০ সে.মি.) পরিণত করা হয়। এখানে পোনা ১-২ মাস (৩০-৬০ দিন) ধরে পালন করা হয়। আয়তন ২০-৪০ শতক।
    • ৩. মজুত পুকুর (Stocking Pond): এটি মাছ চাষের প্রধান পুকুর। এখানে আঙুলিপোনা ছেড়ে বড় মাছে (বিক্রির উপযোগী) পরিণত করা হয়। এর আয়তন সাধারণত ৩০ শতকের উপরে হয়ে থাকে।

    মূল্যায়ন: বহুনির্বাচনি প্রশ্ন (MCQ)

    সঠিক উত্তরে ক্লিক করুন

    ১. প্রশ্ন এখানে আসবে

    সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর

    উদ্দীপক: জনাব শফিক তার বাড়ির পাশের একটি পুকুরে রুই, কাতলা ও মৃগেল মাছ চাষের উদ্যোগ নিলেন। পুকুরটির পাড়ে অনেক বড় বড় গাছ রয়েছে, ফলে সূর্যের আলো পানিতে ঠিকমতো পৌঁছায় না। কিছুদিন পর তিনি লক্ষ্য করলেন, তার পুকুরে মাছের বৃদ্ধি আশানুরূপ হচ্ছে না, বিশেষ করে পুকুরের তলদেশের মাছগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে।
    (ক) পালন পুকুর কী?
    উত্তর: যে পুকুরে ধানী পোনা ছেড়ে আঙুলিপোনা বা চারা পোনায় পরিণত করা হয়, তাকে পালন পুকুর বলে।
    (খ) পুকুরের পানিতে সূর্যের আলোর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করো।
    উত্তর: পুকুরে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পড়লে পানিতে থাকা ফাইটোপ্লাংকটন (উদ্ভিদকণা) সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি করে এবং পানিতে অক্সিজেন ছড়ায়। এতে পরিবেশ ভালো থাকে। আলো না পৌঁছালে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
    (গ) শফিকের পুকুরে মাছের বৃদ্ধি আশানুরূপ না হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করো।
    উত্তর: শফিকের পুকুরের পাড়ে বড় বড় গাছ থাকায় পানিতে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পৌঁছায় না। আলো না থাকায় ফাইটোপ্লাংকটন খাদ্য তৈরি করতে পারে না, ফলে পানিতে প্রাকৃতিক খাদ্যের অভাব দেখা দেয়। এছাড়া গাছের পাতা পচে তলদেশে ক্ষতিকর গ্যাস তৈরি হয় এবং অক্সিজেনের ঘাটতি হয়। এসব কারণেই মূলত তার পুকুরে মাছের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
    (ঘ) শফিকের পুকুরটিকে একটি আদর্শ পুকুরে রূপান্তর করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত? বিশ্লেষণ করো।
    উত্তর: শফিকের পুকুরটিকে একটি আদর্শ মাছের পুকুরে রূপান্তর করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:

    ১. গাছপালা ছাঁটাই: পুকুরের পাড়ের বড় গাছগুলোর ডালপালা ছেঁটে ফেলতে হবে যাতে পানিতে প্রচুর রোদ পড়ে।
    ২. কাদা অপসারণ: তলদেশে জমে থাকা পচা পাতা ও অতিরিক্ত কাদা (২০-২৫ সে.মি. এর বেশি হলে) তুলে পরিষ্কার করতে হবে।
    ৩. পাড় উঁচু করা: বন্যার পানি যেন প্রবেশ করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রেখে পুকুরের পাড় উঁচু ও মজবুত করতে হবে।
    ৪. পানির স্তর ঠিক রাখা: পুকুরে যেন সারা বছর পরিমিত পানি থাকে তার ব্যবস্থা করতে হবে।

    এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করলে পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হবে, অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়বে এবং মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।

    ধন্যবাদ

    অধ্যায় ২: পরিচ্ছেদ ২ এর সমাপ্তি

    কোনো প্রশ্ন থাকলে জিজ্ঞাসা করতে পারেন।



    ১ / ১০
    কিবোর্ড ⬅️ ➡️