তৃতীয় পরিচ্ছেদ: পুকুর প্রস্তুতকরণ

    লেখার আকার:
    কৃষিশিক্ষা - দ্বিতীয় অধ্যায়: তৃতীয় পরিচ্ছেদ (পুকুর প্রস্তুতকরণ)
    📚 কৃষিশিক্ষা - অধ্যায় ২: পরিচ্ছেদ ৩
    দাখিল - নবম ও দশম শ্রেণি

    কৃষিশিক্ষা

    দ্বিতীয় অধ্যায়: কৃষি উপকরণ

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ: পুকুর প্রস্তুতকরণ

    পুকুর প্রস্তুতকরণ

    পুকুর প্রস্তুতকরণের প্রয়োজনীয়তা

    মাছ চাষের পূর্বশর্ত হলো ভালোভাবে পুকুর প্রস্তুত করা। জমিতে যেমন বীজ বোনার আগে জমি চাষ ও সার দিয়ে প্রস্তুত করতে হয়, ঠিক তেমনি পুকুরে মাছ ছাড়ার আগে পুকুরকে মাছের বসবাসের উপযোগী করে তুলতে হয়।

    এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো:

    • মাছের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি।
    • রোগজীবাণু ও ক্ষতিকর পোকামাকড় দূর করা।
    • প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করা।
    পুকুর প্রস্তুতির ধারণা

    ধাপ ১ ও ২: পাড় মেরামত ও আগাছা দমন

    পুকুর প্রস্তুত করার প্রধান ধারাবাহিক ধাপগুলোর প্রথম দুটি হলো:

    ১. পাড় ও তলদেশ মেরামত

    পুকুরের পাড় ভাঙা থাকলে বা গর্ত থাকলে তা মাটি দিয়ে ভালোভাবে মেরামত করতে হবে। পাড় উঁচু করতে হবে যেন বন্যার পানি না ঢোকে। তলদেশে কাদা বেশি থাকলে (২০-২৫ সে.মি. এর বেশি) অতিরিক্ত কাদা তুলে ফেলতে হবে।

    ২. জলজ আগাছা দমন

    কচুরিপানা, কলমিলতা, হেলেঞ্চা ইত্যাদি জলজ আগাছা পুকুরের সার ও সূর্যালোক শুষে নেয়। তাই শেকড়সহ সম্পূর্ণ আগাছা টেনে তুলে পরিষ্কার করতে হবে।

    ধাপ ৩: রাক্ষুসে ও অচাষযোগ্য মাছ দূরীকরণ

    শোল, বোয়াল, গজার, টাকি ইত্যাদি রাক্ষুসে মাছ চাষের পোনা খেয়ে ফেলে। পুঁটি, চাঁন্দা ইত্যাদি অচাষযোগ্য মাছ মাছের খাবারে ভাগ বসায়। এগুলো দূর করার কয়েকটি উপায় রয়েছে:

    • পুকুর শুকিয়ে ফেলা: পুকুর পুরোপুরি শুকিয়ে রোদে ফেলে রাখলে সব মাছ ও জীবাণু মারা যায়। এটি সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি।
    • জাল টানা: পুকুর শুকানো সম্ভব না হলে বারবার ঘন ফাঁসের জাল টেনে এসব মাছ তুলে ফেলতে হবে।
    • ওষুধ বা রোটেনন প্রয়োগ: জাল টেনেও সব মাছ না উঠলে রোটেনন পাউডার বা মহুয়া খৈল প্রয়োগ করে মাছ মেরে ফেলতে হয়।
    রাক্ষুসে মাছ দূরীকরণ

    ধাপ ৪: চুন প্রয়োগ (Liming)

    মাছ দূর করার পর পুকুরে চুন প্রয়োগ করতে হয়।

    চুন প্রয়োগের সুবিধা:

    • মাটির ও পানির অম্লত্ব (pH) ঠিক রাখে।
    • পানি পরিষ্কার করে ও রোগজীবাণু ধ্বংস করে।
    • সারের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়।

    মাত্রা: সাধারণত প্রতি শতকে ১-২ কেজি হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করতে হয়।

    চুন প্রয়োগ

    ধাপ ৫: সার প্রয়োগ

    চুন প্রয়োগের ৫-৭ দিন পর পুকুরে সার দিতে হয়। সার দিলে পুকুরে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য (ফাইটোপ্লাংকটন ও জুপ্লাংকটন) তৈরি হয়।

    সারের ধরন সারের নাম শতক প্রতি পরিমাণ
    জৈব সার গোবর ৫-৭ কেজি
    অথবা, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ৩-৪ কেজি
    রাসায়নিক সার ইউরিয়া ১০০-১৫০ গ্রাম
    টিএসপি (TSP) ৫০-৭৫ গ্রাম

    ধাপ ৬: প্রাকৃতিক খাদ্য পরীক্ষা

    সার প্রয়োগের ৫-৭ দিন পর পানির রঙ হালকা সবুজ বা বাদামি-সবুজ হলে বুঝতে হবে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয়েছে। এটি পরীক্ষার পদ্ধতিগুলো হলো:

    • সেকি ডিস্ক পরীক্ষা (Secchi Disk): এটি ২০ সে.মি. ব্যাসের একটি সাদা-কালো থালা। সুতো দিয়ে পানিতে ডোবালে যদি ২৫-৩০ সে.মি. গভীরতায় ডিস্কটি আর দেখা না যায়, তবে বুঝতে হবে খাদ্য তৈরি হয়েছে।
    • হাত পরীক্ষা: পুকুরে কনুই পর্যন্ত হাত ডোবালে যদি হাতের তালু দেখা না যায়, তবে খাদ্যের পরিমাণ ঠিক আছে।
    • গ্লাস পরীক্ষা: কাঁচের গ্লাসে পুকুরের পানি নিয়ে রোদে ধরলে যদি পানিতে সবুজ কণা ভাসতে দেখা যায়, তবে খাদ্য আছে।

    সৃজনশীল প্রশ্ন (CQ)

    উদ্দীপক: জনাব রফিক তার ২০ শতক আয়তনের একটি পুরোনো পুকুরে রুই-কাতলা চাষের উদ্যোগ নিলেন। পুকুরটিতে প্রচুর কচুরিপানা ও শোল-গজার মাছ ছিল। তিনি পুকুরটি না শুকিয়েই প্রথমে আগাছা পরিষ্কার করে জাল টেনে কিছু শোল মাছ ধরলেন। এরপর তিনি প্রতি শতকে ১ কেজি হারে পুকুরে চুন প্রয়োগ করলেন। এর ৭ দিন পর তিনি পুকুরে গোবর সার দিলেন।
    • ক) পুকুরে চুন প্রয়োগের মাত্রা কত?
    • খ) পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয়েছে কিনা তা কীভাবে গ্লাস দিয়ে পরীক্ষা করা যায়?
    • গ) উদ্দীপকে উল্লেখিত শোল-গজার মাছ সম্পূর্ণ দূর করার জন্য জনাব রফিক আর কী কী পদক্ষেপ নিতে পারতেন? বর্ণনা করো।
    • ঘ) জনাব রফিকের চুন ও সার প্রয়োগের যৌক্তিকতা কৃষিশিক্ষার আলোকে বিশ্লেষণ করো।

    সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

    ক) পুকুর প্রস্তুতের সময় সাধারণত প্রতি শতকে ১-২ কেজি হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করতে হয়।

    খ) একটি স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাসে পুকুরের পানি নিয়ে সূর্যের আলোর দিকে রোদে ধরলে যদি পানিতে সবুজ কণা ভাসতে দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে পুকুরে ফাইটোপ্লাংকটন বা প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয়েছে।

    গ) উদ্দীপকে জনাব রফিক পুকুর না শুকিয়ে জাল টেনে কিছু রাক্ষুসে মাছ (শোল-গজার) ধরেছেন, কিন্তু এতে সম্পূর্ণ মাছ দূর হয় না। অবশিষ্ট মাছ সম্পূর্ণভাবে দূর করতে তিনি পুকুরের পানিতে রোটেনন পাউডার বা মহুয়া খৈল প্রয়োগ করতে পারতেন। রোটেনন বা মহুয়া খৈল পানিতে দিলে এর বিষক্রিয়ায় সব ধরনের মাছ মারা গিয়ে ভেসে ওঠে এবং তখন সেগুলো সহজে সংগ্রহ করা যায়। এটি জাল টানার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরী পদ্ধতি।

    ঘ) জনাব রফিকের চুন ও সার প্রয়োগের সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত। পুকুরে চুন প্রয়োগ করলে তা মাটির ও পানির অম্লত্ব (pH) ঠিক রাখে, পানি পরিষ্কার করে এবং বিভিন্ন রোগজীবাণু ধ্বংস করে মাছের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করে। চুন প্রয়োগের ফলে পরবর্তীতে দেওয়া সারের কার্যকারিতাও বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, সার প্রয়োগের ফলে পুকুরে ফাইটোপ্লাংকটন ও জুপ্লাংকটন নামক প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয়, যা রুই-কাতলা মাছের প্রধান খাবার। তাই মাছের সুস্থতা ও দ্রুত বৃদ্ধির জন্য তার এ দুটি পদক্ষেপ পুকুর প্রস্তুতির জন্য অপরিহার্য ছিল।

    মূল্যায়ন: বহুনির্বাচনি প্রশ্ন (MCQ)

    সঠিক উত্তরে ক্লিক করুন

    ১. প্রশ্ন এখানে আসবে

    ধন্যবাদ

    অধ্যায় ২: পরিচ্ছেদ ৩ এর সমাপ্তি

    পুকুর সম্পূর্ণ প্রস্তুত হলে প্রাকৃতিক খাদ্য পরীক্ষার পর সঠিক নিয়মে মাছের পোনা ছাড়তে হবে।



    ১ / ১১
    কিবোর্ড ⬅️ ➡️